সবাই কেনো আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে করে মাতামাতি?

ডা. সাঈদ এনাম

______________________

বিশ্বের সবাই আমেরিকার ইলেকশন নিয়ে টুকটাক টেবিল টক করছেন। বাইডেন না ট্রাম্প কে হতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট। কি হবে ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এর কারন কি?
মুল কারন আমেরিকায় বসবাস। সারা বিশ্বের সকল মানুষের কমবেশ আত্মীয়, অনাত্মীয়, পরিচিত জন, বন্ধুবান্ধব আমেরিকায় থাকেন। আমেরিকা এমন একটি দেশ, যে দেশে বিশ্বের সব দেশের মানুষের সমাহার। ফুটপাত ধরে হাটলে দেখা যাবে সাদা, কালো, বাদামী, লম্বা, খাটো নানান বর্ণের, নানান ঢং এর মানুষের আনাগোনা।
ছোট একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। একটা সেমিনারে প্রেসেন্টার হয়ে আমেরিকা যাওয়া হয় গেলো বছর। ক্যালিফোর্নিয়ার তে ছিলো সেমিনার। ছিলাম ৫ দিন।
যে হোটেলে ছিলাম তার ম্যানেজার ভদ্র মাঝ বয়সী মহিলা। নিজ দেশ এলসেলভেডর। দশ বারো বছর হলো পরিবার পরিজন নিয়ে আমেরিকা সেটেল্ড হয়েছেন। ছেলে মেয়েরা কলেজে পড়ছে। পরিবারের আয় সংকুলানে পার্ট টাইম চাকুরী এই হোটেলে।
সেমিনারে দুপুরে হালকা লাঞ্চ সারতাম মসকন সেন্টার এর পাশে এক রেস্টুরেন্টে। সেখানের ওয়েটার ছিলো তুরস্কের। তারা দুই ভাই সেই হোটেলে কাজ করেন। রাতে তারা থাকেন পাশেই একটা হোস্টেলে -শেয়ারে। খুব কষ্টে। টাকা জমানোর জন্যে তাদের হোস্টেলে থাকা। তাও থাকা খাওয়াতে গুনতে হয় মাস শেষে প্রায় দু’আড়াই হাজার ডলার।
মাস শেষে দুভাই যা পান জমিয়ে সব দেশে পাঠান। সেখানে তাদের পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন দালান উঠছে। একটি বোন আছে তার বিয়ে দিয়েছেন। আরো ছোট কয়েকটি ভাই। তারা পড়া লেখা করছে।
কষ্টে থাকলেও ভালো আছেন, কারন পরিবারের সবাই ভালো আছে। তারা পরিবার কে সাপোর্ট দিতে পারছেন। স্থায়ী কাগজ পত্র ঠিক হয়নি এখোনও, তবে তারা আর বেশিদিন থাকবেন না। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে।
সন্ধ্যায় গুগল ম্যাপ দেখে হেটে হেটে কফি খেতে যেতাম পাশেই একটা কফি শপে। সেখানে যে কফি সার্ভ করতো তার বাড়ি ছিলো নেপাল। বেশিদিন হয়নি এসেছে। বাংলাদেশের ইউ এস বাংলা ফ্লাইট বিধ্বস্ত হয়ে নিহত এক মেডিকেল স্টুডেন্ট ছিলো তার পূর্ব পরিচিত। সে মেডিকেলে চান্স পায়নি, পরে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে কোন মতে আমেরিকা চলে এসছে। আমাকে আশেপাশে কোথায় কোথায় ঘোরার জায়গা আছে গুগল ম্যাপ সে সব বুঝিয়ে দিতো।
সিমকার্ড কিনতে গেলাম, T- Mobile Show Room। শো-রুম এ যখন ঢু মারি তখন বুঝতে পারিনি এটা আমেরিকার T-Mobile এর সবচেয়ে বড় শো-রুম । চমৎকার শো-রুম। যে দুজন মোবাইল ও সিমকার্ড এর প্যাকেজ গুলো র সুবিধা ব্রিফ করছিলেন তারা একজন চায়নার আরেকজন থাইল্যান্ড এর। তরুন তরুনী দুজনেই কলেজ স্টুডেন্ট। চমৎকার ব্যবহার।
কোন ব্যতিব্যস্ততা বা হেয়ালী নেই, সকল ব্যস্ততা যেনো আমাকে ঘিরেই। যা জানতে চাচ্ছি সবই অত্যন্ত ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে। শর্ট টাইম ভিজিট তাই কোন প্যাকেজ ভালো হবে, সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন দুজন। ধৈর্য হারা হচ্ছেন না।
থাইল্যান্ডের তরুণীটি আরেক কাঠি এগিয়ে। সে একটা ছোট কাগজে প্যাকেজের সুবিধা গুলো টুক টুক করে ঐকিক নিয়মের অংকের মতো লিখে বুঝাচ্ছিলো। এক পর্যায়ে নিজেই একটা ঠান্ডা পানির বোতল এনে দিলো। ‘ইউ আর সিমস টু বি থ্রাস্টি।প্লীজ টেক’। আমি আসলেই থ্রাস্টি ছিলাম। হেটে হেটে শহর টি দেখছিলাম।
সেমিনার ছিলো মসকন সেন্টারে। সেখানের বিশাল বিশাল সেমিনার হল রুম গুলোর পাশেই প্রেসেন্টারদের হ্যান্ড ব্যাগ রাখার জন্যে বড় সড় একটা খোলা জায়গা । সাহায্য করার জন্যে দুজন মহিলা সারাক্ষণ বসে থাকতেন।
একজন মধ্যবয়সী আরেকজন অপেক্ষাকৃত কম। হাই-হ্যালো আলাপে জানালেন, ‘আমি এখানে পার্ট টাইমজব করি, আর এ হচ্ছে আমার মেয়ে। কলেজে পড়ে। তাদের বাড়ি জাপান।
ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসার সময় নিউইয়র্ক হয়ে আসলাম। আম্মা থাকেন সেখানে, দেখতে গেলাম। মোবাইল নেটওয়ার্ক এর সমস্যা করছিলো। জামাইকা সিটিতে মনে মনে T-Mobile এর শো-রুম খুজছিলাম। পেয়েও গেলাম। সেখানের শো-রুমে এক বাংলাদেশী মেয়ে। তার সাথে বাংলাতেই কথা বললাম। ইংরেজিতে সে ঐ চায়নিজ আর থাইল্যান্ডের ছেলে মেয়েদের মতো অতো এক্সপার্ট না। বরিশাল বাড়ি। বছর দুয়েক হলো পাড়ি জমিয়েছে পরিবারের সাথে।
সার্ট কিনতে একদিন গেলাম ব্রুকলিনের একটা দোকানে। বয়স্ক ভদ্র লোকটির বাড়ি বিধ্বস্ত লিবিয়াতে।
পাঞ্জাবী কিনতে পাশের একটি দোকানে ঢুকলাম। সেখানে পেলাম পাকিস্থানি। পাশেই আরেকটা শো-পিস এর দোকান। সেটা ভারতীয় মালিকানাধীন।
ব্রুকলিনের রাস্তায় দেখলাম বেশ কিছু ছেলে মেয়ে ফুটপাতে হাঠাহাটি করছে। মাথায় কালো ছোট টুপি, কালো লম্বা স্যুট। এই প্রথম আমি ইহুদি ধর্মানুসারীদের দেখলাম। প্রায় সবারই একই স্টাইলে পোশাক আশাক চলা ফেরা।
সম্ভবত ঐ এলাকায় ইহুদি বসবাস বেশী। বাই সাইক্লিং করছিলো কয়েকটি ছোট ছোট বাচ্ছা। কি চমৎকার হাই হ্যালো করে যাচ্ছিলো। আনমনে উপভোগ করছিলাম।
বাল্যবন্ধু এজাজ ছিলো সাথে সেই ম্যানহাটন ঘুরে ফিরে দেখাচ্ছে। তাকে বললাম, ওদের একটা ছবি তুলে দে, এই প্রথম ইহুদি ধর্মানুসারী দের সাথে দেখা। পৃথিবীর সব মানুষ দেখতে একই রকম। সে সায় দিলো না।
রিপন, ইমরুল, ডা.আশফাক, ডা. আকাশ, জামাল সহ অনেক বাল্যবন্ধু একহলাম ম্যানহাটনে।
সব দেশের সব ধর্ম, জাতের, মানুষের চমৎকার সহাবস্থান আমেরিকায়। দেশ, ধর্ম, গোত্র ভিন্ন হলেও এখানে তারা সবাই মনে প্রানে এক এবং আমেরিকান।
বিশ্বের সকল দেশের ধনী গরীব নির্বিশেষে সবারই লতায় পাতায় পরিচিত আত্মীয়জনে বসবাস আমেরিকায় আর সেকারনেই বোধ হয় সবাই আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে মেতে উঠে উৎসবে।
ডা. সাঈদ এনাম
সাইকিয়াট্রিস্ট
সহকারী অধ্যাপক। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*