বছরে মারা যায় পাঁচ শতাধিক মানুষ তিন কোটি টাকার যন্ত্রপাতির অভাবে

মাত্র তিন কোটি টাকার যন্ত্রপাতির অভাবে বছরে গড়ে পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটছে ব্রেইন স্ট্রোকে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত বহু মানুষই চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্ছিত হচ্ছে। আইসিইউ সুবিধা না থাকায় বহু রোগিকে অপারেশন করেও বাঁচানো সম্ভব হয় না। এ ভয়াবহ অবস্থা চট্টগ্রামের স্ট্রোকের রোগীদের ক্ষেত্রে। এ অবস্থায় আজ সারা বিশ্বের মতো চট্টগ্রামেও নানা আয়োজনে ‘বিশ্ব স্ট্রোক দিবস’ পালিত হচ্ছে।

মূলত সচেতনতার মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি যে বহুলাংশে কমিয়ে আনা যায়, তার জানান দিতেই এ দিবসটি পালিত হয়।
নিউরো সার্জারী ও নিউরো মেডিসিনের একাধিক চিকিৎসকের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, মাথার অভ্যন্তরে রক্ত জমাট বাঁধা কিংবা রক্তক্ষরণের ফলে এ রোগ হয়। দেহের রক্তের মাত্র ২% মস্তিষ্ক ব্যবহার করে। কিন্তু মস্তিষ্কের কোষসমূহ অত্যন্ত সংবেদনশীল। অক্সিজেন বা শর্করা সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হলে অত্যন্ত দ্রুত এই কোষগুলো নষ্ট হতে শুরু করে। আর এসব কোষ শরীরের যেসব অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো সেগুলো অবশ ও অচল হয়ে প্যারালাইজড হতে শুরু করে।

চিকিৎসকরা বলেছেন, দুই ধরনের স্ট্রোক হয়। প্রথমত রক্ত জমাট বাঁধার কারণে ও দ্বিতীয় রক্তক্ষরণের কারনে স্ট্রোক হয়। রক্ত জমাট বাঁধাজনিত স্ট্রোকে মৃত্যুঝুঁকি কম থাকে। তবে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তবে স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সবকিছুই এত দ্রুত ঘটতে থাকে যে চিকিৎসাটা অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে শুরু করতে হয়।

চিকিৎসকরা বলেন, বাংলাদেশে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ স্ট্রোক। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পরিচালিত এক সমীক্ষার উদ্বৃতি দিয়ে গতকাল চিকিৎসকরা বলেছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে যত রোগী মারা যায় তার অন্তত ২০ শতাংশই মারা যায় স্ট্রোকে। বর্তমানে দেশে স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি।

চট্টগ্রামে এই হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি বলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। প্রতি এক হাজারে ৩ জন মানুষ স্ট্রোকের শিকার হচ্ছেন। অনেকেই স্ট্রোকের সাথে হার্ট এ্যাটাককে গুলিয়ে ফেললেও হার্টের চেয়ে স্ট্রোকে মৃত্যুর হার বেশি। বিশেষ করে নিউরোসার্জারী বিভাগে স্ট্রোকের রোগীদের অপারেশনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আর প্রতিদিনই এই বিভাগে স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী মারা যাচ্ছে। বিশেষ করে নিউরোসার্জারী বিভাগে আধুনিক মাইক্রোস্কোপ নেই, নেই নিউরো এন্ডোস্কোপ বা আধুনিক নিউমেটিক ড্রিলের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র।

আর এসব যন্ত্রের অভাবে স্ট্রোকের বহু রোগীই এখানে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় না। যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা বাইরে চলে যাচ্ছেন। আর যাদের সেই সঙ্গতি নেই তারা ধুকে ধুকে মরছেন।

চমেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারী বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রমের খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারিভাবে মাত্র ৪৫ সিটের এই ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা নিজেরাই সিট বাড়িয়ে করেছেন ৯৫টি। অথচ গতকাল এই ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি ছিল ১৭৮ জন। গতকাল দুইজন স্ট্রোকের রোগীর অপারেশন খুবই জরুরি হলেও শুধুমাত্র আইসিইউ সুবিধা না থাকায় অপারেশন করা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম মেডিকেলের আইসিইউর পঞ্চাশটি সিটে পুরো হাসপাতালের সব সিরিয়াস রোগী ভিড় করেন। অথচ শুধুমাত্র নিউরোসার্জারী বিভাগের জন্য আলাদা আইসিইউ প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোতে নিউরোসার্জারী বিভাগের সাথে আইসিইউ থাকলেও চট্টগ্রামে নেই। গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারী বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাক্তার এসএম নোমান খালেদ চৌধুরী বলেন, সীমিত সামর্থ দিয়ে আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। কিছু কিছু সমস্যা আছে। সমস্যাগুলোর সমাধান হলে বহু মানুষেরই জীবন রক্ষা পেতো বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমাদের কিছু যন্ত্রপাতি খুবই জরুরি। আইসিইউ সুবিধাটা নিশ্চিত করাও দরকার। স্ট্রোকের মতো ভয়াবহ একটি অবস্থাকে সাধারণ আয়োজন দিয়ে মোকাবেলা করা যায় না। এজন্য বাড়তি কিছু প্রস্তুতি এবং যত্ন দরকার। তিনি সরাসরি কোন তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, কিছু সমস্যা আছে। আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করি- সমাধান হয়ে যাবে।

চট্টগ্রামে স্ট্রোকের অবস্থা ভয়াবহ উল্লেখ করে ডা. নোমান খালেদ চৌধুরী বলেন, মেজবানের গরুর মাংসসহ চর্বিযুক্ত খাবার স্ট্রোকের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। শুধুমাত্র সচেতন হলেই স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে ফেলা যায়। তিনি বলেন, একটু হাঁটা চলা, হালকা ব্যায়াম, ধুমপান না করা, উত্তেজিত না হওয়ার মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো যায়। স্ট্রোককে ধনী ও অলসদের রোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অফিসে বসে থাকা,অলস জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিতভাবে প্রেসারের ওষুধ সেবন, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস প্রভৃতির কারনে একজন মানুষের স্ট্রোক হয়। আর এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আজ বিশ্বে ‘ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক ডে’ পালিত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি এবং নিউরোসার্জারী বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আজ ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক ডে পালিত হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে- ‘স্ট্রোক আমাদের থামাতে পারেনি’। এ উপলক্ষে আজ সকাল আটটায় র‌্যালি এবং বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। যাতে স্ট্রোকের বিশ্বের সর্বাধুনিক চিকিৎসার অবস্থা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করবেন।

সূত্র-মেডিনিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*